সমুদ্রের নোনা পানি পানের অযোগ্য হলেও তা উচ্চ মাত্রার লবণের কারণে জলরাশিকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করে এবং জীবন রক্ষাকারী ‘ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন’-কে বাঁচিয়ে রেখে পৃথিবীর সিংহভাগ অক্সিজেনের জোগান দেয়। মানুষের জীবনের তিক্ত ও কঠিন মুহূর্তগুলোও মহান রবের সুনিপুণ পরিকল্পনারই অংশ, যার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের কোনো বড় কল্যাণ ও আনন্দের বার্তা।

কখনো কি ভুলবশত সমুদ্রের এক ফোঁটা পানি মুখে পড়েছে? তীব্র নোনতা আর তিতকুটে স্বাদে মুহূর্তেই ছেয়ে যায় পুরো মুখ। সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে গেলেও সেই বিশাল জলরাশির এক ফোঁটাও পান করার উপায় নেই।
তখন কি কখনো পাড়ে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন—মহান আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ পানিকেই কেন এমন তীব্র লবণাক্ত করে রাখলেন? কেন এই সুবিশাল জলরাশিকে আমাদের পানের যোগ্য মিষ্টি পানি বানিয়ে দিলেন না?
জানলে হয়তো অবাক হবেন, আমাদের অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়া এই তীব্র লবণাক্ততাই আসলে এই ধরণীতে মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি!
সাগরের পানি যদি অন্যান্য সাধারণ জলাশয়ের মতো মিষ্টি হতো, তবে কোটি কোটি জলজ প্রাণীর বর্জ্য আর সাগরে এসে মেশা যাবতীয় ময়লা-আবর্জনার কারণে এত বিশাল জলরাশি পচে দুর্গন্ধ ছড়াত। পুরো পৃথিবী পরিণত হতো এক বাস অযোগ্য নরককুণ্ডে। মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর পক্ষেই বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া সম্ভব হতো না। সমুদ্রের এই অতি উচ্চ মাত্রার লবণই আসলে পুরো জলরাশিকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে; কাজ করছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক ‘অ্যান্টিসেপটিক’ হিসেবে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি কী জানেন? আমাদের অনেকেরই ধারণা—পৃথিবীর সিংহভাগ অক্সিজেন আসে সুন্দরবন কিংবা আমাজনের মতো সুবিশাল বনভূমি থেকে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। আমরা প্রতিদিন যে নিশ্বাস নিই, তার প্রতি দশটি শ্বাসের আটটি অক্সিজেনই আসে সমুদ্রের উপরিভাগে থাকা অণুবীক্ষণিক এক প্রকার উদ্ভিদ ‘ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন’ (Phytoplankton) থেকে!
সাগরের পানি লবণাক্ত না হলে এসব ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বেঁচে থাকতে পারত না। আর এরা না থাকলে সমুদ্রের সমস্ত মৎস্য ও জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেত, থমকে যেত পুরো পৃথিবীর অক্সিজেন সরবরাহ। এক নিমেষেই দম আটকে নিঃশেষ হয়ে যেত সমগ্র মানবজাতি। অর্থাৎ, সাগরের যে নোনা পানিকে আমরা পান করার অযোগ্য ভেবে তুচ্ছ করি, তার কল্যাণেই প্রতিদিন আমরা নিখরচায় বুক ভরে অক্সিজেন নিচ্ছি।
সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসার করুণা এখানেই শেষ নয়। এই যে সাগরের তেতো নোনা পানি—একেই যখন আমাদের পানের যোগ্য করার প্রয়োজন হয়, তখন প্রকৃতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় এক অলৌকিক ‘ওয়াটার ফিল্টার’।
সূর্যের তাপে সাগরের পানি যখন বাষ্প হয়ে আকাশে ডানা মেলে, তখন এক সুনিপুণ নিয়মে সব ক্ষতিকর লবণ ও খনিজ উপাদান নিচে পড়ে থাকে। কেবল খাঁটি, বিশুদ্ধ ও নির্মল পানিটুকু বাষ্পীভূত হয়ে মেঘের রূপ নেয়। এরপর সর্বাধুনিক ফিল্টারের চেয়েও নিখুঁতভাবে, পৃথিবীর বিশুদ্ধতম ‘পাতিত পানি’ (Distilled Water) হয়ে তা শান্তিময় বৃষ্টির ধারায় ঝরে পড়ে ধরিত্রীর বুকে।
যে পানি লবণের তীব্রতায় মুখে তোলা যায় না, সেই পানিকেই আবার পরম মমতায় আমাদের তৃষ্ণা মেটাতে মিষ্টি ধারায় বর্ষণ করেন কে?
প্রকৃতির এই অলৌকিক ভারসাম্য আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—তিনিই ‘আল-লাতিফ’। যাঁর দয়া, করুণা এবং প্রতিটি কাজের কৌশল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুনিপুণ। যিনি মানুষের অজান্তে, নেপথ্যে থেকে পরম স্নেহে তাঁর সৃষ্টির জীবনধারণের নিখুঁত ব্যবস্থা করে রাখেন।
আমাদের জীবনটাও কখনো কখনো সমুদ্রের এই নোনা জলের মতোই তিক্ততায় ভরে ওঠে, কঠিন সমস্যায় ঘেরাও হয়ে যায়। আমরা হতাশ হয়ে মনে মনে বলি, “আমার সাথেই কেন এমন হলো?” কিন্তু আমরা ভুলে যাই, সুনিপুণ পরিকল্পকের সেই কষ্টের আবহেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের কোনো বড় কল্যাণ কিংবা প্রাপ্তির নতুন বৃষ্টি!
তাই জীবনের কঠিন ও নোনা অধ্যায়গুলো দেখে কখনো থমকে দাঁড়াবেন না। যিনি সাগরের নোনা পানি ছেঁকে মেঘের ডানায় মিষ্টি বৃষ্টির ধারা নামিয়ে আনতে পারেন, তিনি আপনার জীবনের সব তিক্ততা ধুয়ে-মুছে আনন্দের বৃষ্টি বর্ষণ করতেও পুরোপুরি সক্ষম। শুধু প্রয়োজন একটুকু ধৈর্য আর তাঁর সূক্ষ্ম পরিকল্পনার ওপর অবিচল আস্থা।
2 thoughts on “নোনা জলের অন্তরালে পরম কৃপা”
অত্যন্ত শিক্ষনীয় এবং তথ্যবহুল একটি লেখনী!
শুভকামনা রইলো…
আপনার এমন ইতিবাচক মতামত আমাদের কাজের প্রতি আরও উৎসাহিত করে। সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ!