“আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। নিশ্চয়ই কাফের সম্প্রদায় ছাড়া কেউ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৭)

মানুষ মাত্রই জীবনচক্রে নানা প্রতিকূলতা, পরীক্ষা এবং চড়াই-উতরাইয়ের মুখোমুখি হয়। দুঃখ, বেদনা, অভাব কিংবা ব্যর্থতা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু একজন মুমিন (ঈমানদার ব্যক্তি) যখন এই পরীক্ষার মুখোমুখি হন, তখন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা হওয়া উচিত। কারণ, ইসলামে হতাশা বা নিরাশার কোনো স্থান নেই; বরং মুমিনের জন্য হতাশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম।
হতাশা কেন মুমিনের জন্য নিষিদ্ধ?
হতাশা মূলত আল্লাহর রহমত ও তাঁর অসীম ক্ষমতার ওপর অবিশ্বাসের নামান্তর। যখন কোনো বান্দা চরম বিপদে পড়ে সব হারিয়ে গেছে ভেবে নিরাশ হয়ে পড়ে, তখন সে প্রকারান্তরে আল্লাহর কুদরত এবং তাঁর প্রতিশ্রুতির ওপর সন্দেহ পোষণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন:
“আর আল্লাহর রহমত থেকে কে নিরাশ হয়, গোমরাহগণ ছাড়া?” (সুরা আল-হিজর, আয়াত: ৫৬)
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, নিরাশ হওয়া বা আশা ছেড়ে দেওয়া কেবল কাফের বা পথভ্রষ্টদের বৈশিষ্ট্য। একজন প্রকৃত মুমিন যতই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ুন না কেন, তিনি কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে পারেন না।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে আশার বাণী
ইসলাম মুমিনকে সবসময় আশাবাদী হতে শিক্ষা দেয়। দুনিয়ার জীবনে বিপদাপদ হলো ঈমানের পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ শুধু এ কথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না?” (সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিনের জীবনকে এক চমৎকার উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন:
“মুমিনের বিষয়টি কী আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি কাজেই কল্যাণ রয়েছে। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে হয় না। তার কোনো ভালো কিছু অর্জিত হলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তার কোনো ক্ষতি বা বিপদ আসে, সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে সেটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” (সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ, একজন মুমিন সুদিনে শুকরিয়া আদায় করে আর দুর্দিনে সবর (ধৈর্য) ধারণ করে। উভয় অবস্থাতেই তার জন্য রয়েছে পুরস্কার।
হতাশা কাটানোর কার্যকরী উপায়
১. তাকদিরের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা: বিশ্বাস করতে হবে যে, যা কিছু ঘটেছে বা ঘটছে, তা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত প্রজ্ঞার আলোকেই হচ্ছে। এতে আমাদের সাময়িক কষ্ট হলেও এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কল্যাণ লুকিয়ে আছে। ২. কঠিন সময়ের পর স্বস্তির সুসংবাদ: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ দু’বার বলেছেন—“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।” (সুরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬)। সুতরাং, প্রতিটি অন্ধকারের পরেই আলোর সকাল অবধারিত। ৩. আল্লাহর জিকির ও দোয়া: মন যখন সংকীর্ণ বা হতাশ হয়ে পড়ে, তখন বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) ও আল্লাহর জিকির করা উচিত। আল্লাহর স্মরণে হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে। ৪. সহজ ও ইতিবাচক মনোভাব: নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করে বাকি ফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া মুমিনের কাজ। ফলাফল যাই হোক না কেন, আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক।
সুতরাং, হতাশা মানুষের মনকে দুর্বল করে দেয় এবং কর্মক্ষমতা কেড়ে নেয়। কিন্তু একজন মুমিনের হৃদয় সবসময় আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) এবং তাঁর রহমতের আশায় দীপ্ত থাকে। তাই হাজারো ঝড়-ঝাপটা এলেও মুমিন কখনো ভেঙে পড়ে না। আসুন, জীবনের প্রতিটি বাঁকে হতাশাকে দূরে ঠেলে দিয়ে আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস ও আশার আলো নিয়ে এগিয়ে চলি।