ঈমান তো বিক্রি করার জিনিস নয় : সততা, ইসলাম ও একজন তরুণ বিক্রেতার গল্প

বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে ব্যবসায়িক সততা, নৈতিকতা এবং মানুষের অধিকার রক্ষাই যে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য। ইসলাম কেবল মসজিদকেন্দ্রিক সালাত, সিয়াম বা বাহ্যিক পোশাক-আশাকের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দৈনন্দিন লেনদেনে সততা, ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা এবং মানুষের অধিকার (হাক্কুল ইবাদ) রক্ষাই ঈমানের আসল পরীক্ষা। বাহ্যিক ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সাথে নৈতিক আচরণ ও সততা বজায় রাখাই যে একজন প্রকৃত মুসলিমের মূল পরিচয়—লেখাটিতে সেটিরই একটি জীবনঘনিষ্ঠ ও হৃদয়স্পর্শী বার্তা ফুটে উঠেছে।

বনশ্রীতে টিভি সেন্টারের পাশ দিয়ে হেঁটে এ-ব্লকে ঢোকার ঠিক মুখেই হাতের ডান দিকে ছোট একটা নতুন দোকান। মোস্ট অফ দ্য টাইম ইয়াং একটা ছেলে দোকানে বসে থাকে। মুখে সুন্নতি লম্বা দাড়ি, বয়সে হয়তো আমার সমান বা কিছুটা ছোট হবে।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ নজরে এলো দোকানের তাকে মধুর কয়েকটি জার সাজানো। ভাবলাম, বিশুদ্ধ মধু পাওয়া সহজ নয়, কিনে নিয়ে যাই। ভেতরে ঢুকে একটি জার দিতে বললাম এবং কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, মধুটা একদম খাঁটি তো?”

ছেলেটি বিনয়ের সাথে উত্তর দিল, “জ্বী ভাই, আলহামদুলিল্লাহ পুরোপুরি। আমরা যেদিন মধু সংগ্রহ করতে যাই, আমাদের চোখের সামনে চাক কেটে যতটুকু মধু বের করা হয়, আমরা কেবল ততটুকুই নিয়ে আসি। তার বাইরে এক ফোঁটাও ভেজাল বা বাড়তি কিছু মেশানো হয় না।”

কথাটি শুনে মনটা ভরে গেল। দাম চুকিয়ে দিলাম। আমি দোকানের আরও দু-একটি জিনিস ঘুরে দেখছিলাম, ঠিক তখন একজন মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা দোকানে ঢুকলেন। একটি পণ্য হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা ভালো তো?”

ছেলেটি বলল, “জ্বী আপু, আমার জানামতে এটাই সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির। তাই দোকানে এটিই রেখেছি।”

ভদ্রমহিলা একটু সংশয়ের সুরে বললেন, “সব বিক্রেতাই তো এমন মিষ্টি কথা বলে। আজকাল কি আর চেহারার দাড়ি-টুপি দেখে মানুষকে বিশ্বাস করা যায়?”

এরপর ছেলেটি যে উত্তরটি দিল, তার জন্য আমি সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না। কিছুটা মলিন মুখে ও ভারাক্রান্ত সুরে ছেলেটি বলল:

“আপু, এখানে তো আমি জিনিস বিক্রি করতে আসছি, ঈমান না…”

কথাটি শোনার পর স্তব্ধ হয়ে গেলাম। প্রায় মাস দেড়েক আগের ঘটনা এটি, কিন্তু এই ছোট্ট বাক্যটি কত শতবার যে মনে পড়েছে, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এই তরুণ বিক্রেতার এই সংক্ষিপ্ত উপলব্ধিটুকু যে কত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ, তা হাজারবার বুঝিয়েও হয়তো শেষ করা যাবে না।

আমাদের সমাজে আজ দেড় বিলিয়ন মুসলিমের উপস্থিতি সত্ত্বেও কেন এত অবক্ষয়? এর পেছনে বড় কারণ হলো—আমরা ধর্মকে কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা বাহ্যিক রূপের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি।

অনেকে মনে করেন—ধার্মিকতা মানে কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রথা মেনে চলা, মাথায় টুপি বা মুখে দাড়ি রাখা, লম্বা পোশাক পরা আর হজ বা ওমরাহ পালন করা। নিঃসন্দেহে এগুলো ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ইসলাম কি কেবল এতটুকুই?

অনেকে বলেন, “সব জায়গায় ধর্ম টেনে আনবেন না।” কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য হলো—একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজেই তার ঈমান প্রতিফলিত হবে। আপনার সালাত ও সিয়াম যেমন ঈমানের প্রকাশ, ঠিক তেমনি দোকানে আসা ক্রেতার সাথে প্রতারণা না করে সঠিক ও সত্য পণ্যটি তুলে দেওয়াও আপনার ঈমানেরই অংশ। একটু বাড়তি মুনাফার লোভে সারাদিন রোজা রেখে রাতে ক্রেতাকে মিথ্যা বলে নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে দেওয়া মানে—ওই সামান্য টাকার বিনিময়ে নিজের ঈমানকেই বিক্রি করে দেওয়া।

ইসলাম মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও সম্মানকে কতটা মর্যাদা দিয়েছে, তা অনুধাবন করলে অবাক হতে হয়। সাহাবিরা একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন এক নারীর কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন, যে প্রচুর নফল সালাত আদায় করত, নফল সিয়াম রাখত এবং দান-সদকা করত; কিন্তু তার মুখের ভাষা দিয়ে প্রতিবেশীদের কষ্ট দিত। আল্লাহর রাসূল (সা.) পরিষ্কার বলে দিলেন—“সে জাহান্নামী।” (মুসনাদে আহমাদ)।

চিন্তা করে দেখুন, আমরা যখন মানুষের অধিকার খর্ব করি, দু নম্বর খাবার খাইয়ে মানুষের ক্ষতি করি, ঘুষ খাই কিংবা অন্যের জায়গা-জমি দখল করি—তখন কি কেবল বাহ্যিক ইবাদত আমাদের রক্ষা করতে পারবে? মানুষের সাথে করা অন্যায় ও জুলুমের হিসাব চুকানো ছাড়া কেবল ইবাদত দিয়ে পার পাওয়া সম্ভব নয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের প্রয়োজনে বের হয় এবং তার কাজটি পূরণ করে দেয়, তা তার জন্য মসজিদে নববীতে ১০ বছর ইতিকাফ করার চেয়েও উত্তম।” (তাবারানি)।

ইসলাম মানুষের উপকার করাকে এতটাই মূল্যায়ন করেছে! এমনকি রাস্তা থেকে একটি কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াকেও ঈমানের অন্যতম শাখা বলা হয়েছে। হয়তো অজান্তেই কারো বিপদে একটু বাড়িয়ে দেওয়া হাত, কোনো অন্ধকে রাস্তা পার করে দেওয়া বা একজন ক্ষুধার্তের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো ছোট্ট সৎকাজটিই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে জান্নাতের উসিলা হয়ে যেতে পারে।

বনশ্রীর সেই দাড়িওয়ালা তরুণের মতো অসংখ্য তরুণ আজ ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করে সত্যের পথে আসছে। তারা অন্ধ অনুকরণ করে নয়, বরং ইসলামের ন্যায়বিচার ও নৈতিকতায় মুগ্ধ হয়ে অনুগত হচ্ছে। এরা ব্যবসায়ের সুযোগ পেয়েও ঈমান বিক্রি করে না। এমনকি ফেসবুকে খাঁটি মধু বিক্রি করতে গিয়েও “১০০% খলিসা ফুলের মধু” লিখতে ভয় পায়—যদি আল্লাহ ধরে বসেন যে মৌমাছি অন্য ফুল থেকেও কিছু মধু এনেছিল! তাই তারা লিখে দেয়—”ইনশাআল্লাহ অন্তত ৯০% খলিসা ফুলের মধু।”

আল্লাহ আমাদের সমাজকে এমন ঈমানদার ও সৎ মানুষে ভরিয়ে দিন। আমাদেরকেও যেন সালাতের পর কেবল মসজিদে ধর্ম রেখে আসার মানুষ না বানিয়ে, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ঈমান বজায় রাখার তৌফিক দান করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top